রবিবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০২৫

ম্যাথ-ম্যাজিসিয়ান

 "তিনজনের মধ্যে তিনটি ফল সমান ভাবে ভাগ করে দিলে, প্রত্যেকে একটি করে পাবে। তেমনি হাজারটা ফল হাজার জনের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দিলে, প্রত্যেকে একটি করে পাবে।" গণিত শিক্ষক এই বলে বিষয়টি সরলীকরণ করে বলেন, "যে কোনো সংখ্যাকে সেই সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে ভাগফল হবে এক"। সঙ্গে সঙ্গে একটি ছাত্র উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলো, “শূন্যকে শূন্য দিয়ে ভাগ করলে কি ভাগফল এক হবে? কোনো ফল যদি কোনো ছেলেদের মধ্যে ভাগ করে না দেওয়া হয়, তাহলেও কি প্রত্যেকে একটি পাবে?”

কিশোর বেলার এমন অপূর্ব গণিতভাবনার সূক্ষ্মতার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল গণিত জগতের বিস্ময়। গণিতশাস্ত্রে যার অবদান বিশ্ববাসীর কাছে শুধু নিজেকেই প্রতিষ্ঠিত করেন নি, জগৎ সভায় ভারতীয় হিসাবে আমাদের গর্বিত করেছেন। তিনি একনিষ্ঠ গণিত সাধক – শ্রীনিবাস রামানুজন।

বর্তমানের তামিলনাড়ু (চেন্নাই) থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে ইরোডের তেল্লুকুলম স্ট্রিটে ১৮৮৭ সালের ২২শে ডিসেম্বর (০৯ অগ্রহায়ণ, বৃহস্পতিবার) ঠিক সূর্যাস্তের পর রামানুজনের জন্ম হয়।

কুল্লুস্বামী শ্রীনিবাস ইয়েঙ্গার ও কোমলতাম্মলের জ্যেষ্ঠ সন্তান রামানুজন। নামের ‘কুল্লুস্বামী’ অংশটি যেমন রামানুজের বাবা তাঁর বাবার কাছ থেকে পেয়েছিলেন, সেই একই রীতি অনুসারে রামানুজও উত্তরাধিকার সূত্রে ‘শ্রীনিবাস’ নামটি তাঁর বাবার থেকে পান।

মা তাঁকে আদর করে ‘চিন্নাস্বামী’ (ছোটো রাজা) হিসাবে ডাকতেন।রামানুজনের বয়স তখন তিন পেরিয়েছে, সাধারণ শিশুদের মতো তাঁর মুখে তখনও বুলি ফোটে নি।চিন্তিত কোমলতা ছেলেকে নিয়ে চলে এলেন বাবা-মা’র কাছে। কাঞ্চীপুরমে রামানুজনের ‘অক্ষরাভ্যাস’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।অনুষ্ঠানে দিদিমা (মায়ের মা) এক একটি অক্ষর জোরে জোরে উচ্চারণ করে রামানুজনের হাত ধরে সেই অক্ষর মেঝের উপর ছড়ানো বালির উপর লেখাতে থাকেন।সবাইকে অবাক করে এই অনুষ্ঠানের কিছুদিন পরই রামানুজন কথা বলা শুরু করেন এবং তামিল অক্ষরগুলি শিখে ফেলেন।১৮৯২ সালের পয়লা অক্টোবর রামানুজনের বিদ্যালয় জীবন শুরু। প্রথমে তিনি একটি ‘পিয়াল’ (এক রকমের পাঠশালা) স্কুলে ভর্তি হন।সেখানে রামানুজের মন বসে না। ১৮৯৪ সাল নাগাদ তাঁকে ‘কঙ্গায়ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে’ ভর্তি করানো হয়। ১৮৯৭ সালে শেষ প্রাথমিক পরীক্ষায় ‘তাঞ্জর’ জেলার মধ্যে প্রথম হন।

১৮৯৮ সালের জানুয়ারি মাসে ‘কুম্ভকোনম টাউন স্কুলে’ ভর্তি হয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে পাশের জন্য অর্ধেক বেতনে এখানে ছয় বছর অতিবাহিত করেন।১৯০৩ সালে তিনি মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ম্যাট্রিকুলেশন’ পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন।

শৈশব থেকেই বাবার থেকে মায়ের সাহচর্য পেয়েছিলেন বেশী। মজার কথা, চেহারাও মায়ের আদলের সঙ্গে তাঁর বেশ মিল ছিল।চোখ দুটি ছিল অসামান্য উজ্জ্বল; সেই চোখ জোড়াই সাক্ষ্য দিত ভবিষ্যতের। মা এবং দিদিমার প্রভাবে রামানুজনও গভীর ভক্তিভাবের অধিকারী ছিলেন।

শান্ত ও নির্জনতা বিলাসী রামানুজন বন্ধুদের গণিতের মুস্কিল আসান। শিক্ষকদের জন্য প্রায় বারোশো ছাত্র এবং প্রায় চল্লিশজন শিক্ষকের টাইম টেবিল করে দিতেন।

ছেলেবেলা থেকেই গণিত নিমগ্নতায় বিভোর হয়ে থাকতেন। এমন সময় সহপাঠীরা তাঁর পায়জামার উপর টুকরো পাথর রেখে দিত। তা তিনি খেয়ালই করতেন না।রামানুজন তখন বর্তমানের অষ্টম শ্রেণির সমতুল্য ক্লাসের ছাত্র। 

রামানুজন তখন তেরো বছরের কিশোর। বাড়ির আর্থিক অসচ্ছলতা দূর করতে অনেক সময় বাড়িতে কলেজের ছাত্রদের বোর্ডার হিসাবে রাখা হত।রামানুজনের ছাত্রাবস্থায় তাঁদের বাড়িতে ত্রিচিনোপলি ও তিরুলোভেলির দুইজন কলেজ ছাত্র থাকতে শুরু করে।গণিতের প্রতি রামানুজনের তীব্র আকর্ষণ দেখে তারা তাঁদের জানা গণিত রামানুজনকে শেখাতে থাকে। সেই সব বিদ্যা আয়ত্ত করে রামানুজন এবার জেদ ধরে কলেজের গণিত বই সমাধান করার।তারা তখন 'এস এল লোনি'র ত্রিকোণমিতি নিয়ে আসে। অন্যের কোনও সাহায্য ছাড়া সমাধানের জন্য দেওয়া প্রত্যেকটি অঙ্ক রামানুজন সমাধান করেন।

তাঁর এক সহপাঠীর কথা - "তিন ঘণ্টার অঙ্ক পরীক্ষা ও বরাবর এক ঘণ্টায় শেষ করত। শুধু তাই নয়, অনেক অঙ্ক আবার তিন-চার রকমভাবে সমাধান করত।”

ব্যর্থতা, আর্থিক অসচ্ছলতা, এমনকি অভুক্ত দিবস যাপন করে ১৯১২ সালের ০৯ ফেব্রুয়ারী, রামানুজন মাদ্রাজ পোর্ট ট্রাস্টের চাকরি পেলেন।একদিন পোর্ট ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ফ্রান্সিসের কাছে তাঁর সই নেবার জন্য একটা ফাইল এল। এই ফাইলের মধ্যে কতগুলি আলাদা কাগজে উপবৃত্তীয় সমাকালের কিছু গাণিতিক ফল লেখা ছিল। তখন তিনি খুব চটে যাবার ভান করে নারায়ণ আয়ারকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তিনি কি আজকাল অফিসের কাজের সময় ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত থাকেন?” নারায়ণ আয়ার বিনম্র ভাবে এটা তার নয় বলে জানালে ফ্রান্সিস প্রশ্ন করলেন, “তা হলে আর কে এ সব উচ্চতর গণিতের শখের চর্চা করেন?”নারায়ণ আয়ার তখন রামানুজনের কথা জানান। রামানুজন তাঁর গণিতমেধা এবং গণিতচর্চার দৌলতে ফ্রান্সিসের স্নেহধন্য হয়ে উঠলেন।

তারিখটা ছিল ১৯১৩ সালের ১৬ই জানুয়ারি। মকরসংক্রান্তির পুণ্য তিথি। রামানুজন কেমব্রিজের গণিতজ্ঞ ‘জি এইচ হার্ডি’কে চিঠি লিখলেন।চিঠির সঙ্গে জুড়ে দিলেন তাঁর এতদিনের গবেষণালব্ধ অনেক সূত্র ও উপাপাদ্য।

১৯১৩ সালের জানুয়ারি মাসের কোনো এক হিমেল সকালে প্রাতরাশ টেবিলে অন্যান্য চিঠির মধ্যে হার্ডি রামানুজনের চিঠিটা পেলেন।কিন্তু প্রাথমিক ভাবে হার্ডির কাছে এগুলো একঘেয়ে লাগল। তখনের মতো সেগুলো পাশে সরিয়ে রেখে তিনি দৈনিক কাজে মন দিলেন।

রাত ন’টার সময় মনস্থির করলেন সূত্র গুলো আর একবার দেখবেন। ডেকে পাঠালেন সহকর্মী ও বিশিষ্ট গণিতজ্ঞ ‘জে ই লিটলউড’কে।দুজনের সামনে রামানুজনের লেখাগুলো ছড়ানো। তাঁরা উপপাদ্যগুলো যতই দেখছেন ততই বিমোহিতহচ্ছেন। শিহরিত তাঁদের গণিত অনুভূতি।সারা কেমব্রিজে খবর ছড়িয়ে পড়ল ভারতের একজন কেরানির প্রতিভার কথা। কেমব্রিজের গণিত-পরিমণ্ডলের সঙ্গে যুক্ত সবাই ভীষণ ভাবে উদ্বেলিত।

রামানুজন হার্ডিকে দ্বিতীয় চিঠি লেখেন ১৯১৩ সালের ২৭ শে ফেব্রুয়ারী। প্রথম ও দ্বিতীয় চিঠিতে তাঁর পাঠানো উপপাদ্যের সংখ্যা একশো কুড়িটি। 

রামানুজন আমন্ত্রণ পেলেন কেমব্রিজে যাওয়ার। কিন্তু সেই বছর রামানুজনের কেমব্রিজ যাওয়া হল না। তৎকালীন সামাজিক পটভূমিতে ‘কালাপানি’ নামক রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ছেলের বিদেশ যাত্রায় মা রাজি ছিলেন না।

১৯১৪ সালের ১৭ই মার্চ এস এস নেভাসা জাহাজে করে রামানুজন ইংল্যান্ড যাত্রা করেন।

ইংল্যান্ডে থাকার সময়ই রামানুজনের বন্ধুত্ব গড়েছিল প্রখ্যাত রাশিবিজ্ঞানী ‘প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ’র সঙ্গে। ইংল্যান্ডে পাঁচ বছর থাকার সময় রামানুজনের একুশটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। সারা জীবনে রামানুজনের মোট ৩৭টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে।নাগোয়া জাহাজে ১৯১৯ সালের ২৭ শে মার্চ রামানুজন মুম্বাই বন্দরে এসে পৌঁছলেন। সাথে বৈজ্ঞানিক কীর্তি, স্বীকৃতি ও অসুস্থতা।

রামানুজন যখন  ভারতে ফিরে আসছিলেন তখন হার্ডির মনে রামানুজের আরোগ্যের ব্যাপারে যথেষ্ট উচ্চাশা ছিল।

 বাস্তব অতি রুঢ়। ১৯২০ সালের ২৬ শে এপ্রিল,প্রতিভা আর আত্মপ্রত্যয়ের জোরে মাত্র ৩২ বছর চার মাস চার দিন বয়সে ভারতকে জগৎ সভার শ্রেষ্ঠ আসনে বসিয়ে ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন প্রবাদপ্রতিম কিংবদন্তী  রামানুজন।তীব্র অর্থকষ্ট, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথাগত ডিগ্রি সংগ্রহে ব্যর্থতা বা শারীরিক অসুস্থতা কোনো কিছুই তাঁকে গণিত-আরাধনার থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেনি।

  জন্মদিনে গণিত-শিল্পীকে শতকোটি প্রণাম। 


-(amit.k.paul487@gmail.com) 


ম্যাথ-ম্যাজিসিয়ান

 "তিনজনের মধ্যে তিনটি ফল সমান ভাবে ভাগ করে দিলে, প্রত্যেকে একটি করে পাবে। তেমনি হাজারটা ফল হাজার জনের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দিলে, প্রত...